জেরাল্ড এফ ডার্কস
[আমেরিকার ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চের মিনিস্টার ছিলেন জেরাল্ড এফ ডার্কস। তিনি"দ্য ক্রস এন্ড দ্য ক্রিসেন্ট" বইয়ের লেখক। খ্রিস্টান ধর্মীয় বিদ্যালয়ে প্রাপ্ত শিক্ষা সম্পর্কে এক সময় তাঁর মােহমুক্তি ঘটে। জীবনের বিভিন্ন বাঁক অতিক্রম করে চলে আসেন ইসলামের মােহনায়-অনুবাদক]
আমার শৈশবের সুখস্মৃতির অন্যতম হচ্ছে রোববার সকালে চার্চের ঘন্টা ধ্বনির সুমধুর আওয়াজ, যা ভােরের প্রার্থনার উদ্দেশ্যে বাজানাে হত। ছােট এক গ্রাম্য শহরে আমি বেড়ে ওঠেছিলাম। পুরাতন মেথডিস্ট চার্চটা ছিল কাঠের তৈরি। এতে ছিল ঘন্টার টাওয়ার। দু'টো শ্রেণীকক্ষ ছিল প্রতি রােববার শিশুদের শিক্ষা দেয়ার জন্য। মধ্যবর্তী কাঠের দরজার অপর পাশে ছিল সেঞ্চুয়ারি। বয়স্ক শিশুদের জন্য ছিল আলাদা শ্রেণীকক্ষ। তাতেও ক্লাশ হত রােববারে। এ চার্চটা আমাদের বাড়ি হতে দু'ব্লক দূরে। ঘন্টাধ্বনি শােনার পর আমাদের পরিবারে সবাই চার্চের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম সাপ্তাহিক প্রার্থনা অনুষ্ঠানে যােগ দেয়ার জন্য।
১৯৫০ সালের সে গ্রাম্য পরিবেশে আমাদের এলাকায় ৫০০ মানুষের জন্য চার্চটি ছিল সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র।
আমাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল স্থানীয় মেথডিস্ট চার্চের সাথেই। ঘরে তৈরি আইসক্রীম, মুরগি ও কর্ন রােস্ট ইত্যাদি খাবার নিয়ে আমরা সেখানে হাজির হতাম। তিনটি চার্চের সাথেই আমাদের যােগাযােগ ছিল, তবে তা হত বছরে একবার মাত্র। প্রতি জুনে দু'সপ্তাহের জন্য বসত কম্যুনিটি বাইবেল স্কুল। স্কুলের ৮ম গ্রেড পর্যন্ত এ সমস্ত ক্লাশে আমি নিয়মিত যােগ দিতাম। রােববার সকালের প্রার্থনা সভা ও স্কুলের ক্লাশ ছিল সাপ্তাহিক কর্মসূচীর অংশ। নিয়মিত এ সব ক্লাশে যােগ দিতাম বলে আমি "উত্তম উপস্থিতি পিন" লাভ করতাম আর বাইবেলের শ্লোক মুখস্ত করার জন্য আমি বিভিন্ন পুরস্কার পেতাম। সেগুলাে আমার সংগ্রহে থাকত আর এসবের সংখ্যাও ছিল অনেক।
আমি যখন নিন্ম মাধ্যমিক স্কুলে পড়ি তখন আমাদের স্থানীয় মেথডিস্ট চার্চটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা পাশবর্তী মেথডিস্ট চার্চে যােগ দেই। আমাদের পূর্বতন চার্চ থেকে এটা ছিল বড়। এখানে আমার মনে চার্চের মিনিস্টার হতে সাধ জাগে ।
মেথডিস্ট ইয়ুথ ফেলােশিপ-এ আমি বেশ সক্রিয় হই। জেলা ও কনফারেন্স অফিসার হিসাবে আমি কাজ করতে থাকি।
বার্ষিক যুব সম্মেলনে আমি একজন ধর্মপ্রচারক হিসাবে নিয়মিতভাবে বক্তৃতা দেই। আমি আমার সম্প্রদায়ের সকল মানুষের ব্যাপক ও বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হই। মাঝে মাঝে অন্যান্য চার্চের অনুষ্ঠানে, নার্সিং হোমে, বিভিন্ন চার্চের সাথে সংশ্লিষ্ট যুব ও নারীদের সম্মেলনেও আমি বক্তৃতা দিতে থাকি। এ সমস্ত সমাবেশে বিপুল লােক সমাগম হত।
১৭ বছর বয়সে আমি হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি হই। তখন চার্চের মিনিস্টার হিসাবে আমার নাম পাকাপােক্ত হয়। এ সময় আমি দু'সেমিস্টারব্যাপী একটি তুলনামূলক ধর্মতত্ব কোর্সে ভর্তি হই। উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মীথ সেখানে পড়াতেন। তাঁর বিষয় ছিল ইসলাম । ক্লাশে আমি ইসলাম ধর্মের চাইতে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের প্রতি বেশি মনােযােগ দিতাম। কারণ এ দু'টো ধর্ম ছিল আমার কাছে কিছুটা রহস্যময় ও অভিনব। আর ইসলামকে মনে হত আমাদের খ্রিস্টান ধর্মমতের কাছাকাছি।
তাই ইসলাম ধর্মের প্রতি যতটুকু মনাযােগ দেয়া আমার উচিত ছিল ততটুকু দিতাম না। তবে আমার মনে আছে একবার কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়ে আমাকে একটা টার্ম পেপার জমা দিতে হয়েছিল। এ কোর্সের শিক্ষামান ছিল খুবই উঁচুস্তরের।
এ জন্য ব্যাপক ও গভীর লেখাপড়া করতে হত। আমার লাইব্রেরিতে অর্ধ ডজনের মত ইসলাম বিষয়ক বই ছিল । সব বই ছিল অমুসলিম লেখকদের লেখা। দীর্ঘ ২৫ বছর পর এ সকল বই আমার কাজে এসেছিল । কুরআনের দু'টো ইংরেজি অনুবাদ আমার ছিল যা আমি তখন পড়তাম। বসন্ত সেমিস্টারে হার্ভার্ড এ আমি হলিস স্কলার নামে পরিচিত হই। এর অর্থ হচ্ছে : কলেজে প্রাক-ধর্মতত্ব ছাত্র হিসাবে আমি শীর্ষস্থানীয়। ১ম ও ২য় বর্ষের মাঝামাঝি গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টারে আমি বৃহত্তর ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চে যুব মিনিস্টার পদে বরিত হই। পরবর্তী গ্রীষ্মে আমি ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চে ধর্ম প্রচার করার সনদ লাভ করি। ১৯৭১ সালে হার্ভার্ড কলেজ হতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। ১৯৭২ সালেই আমি ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চে উচ্চপদস্থ যাজক হই। ইতােপূর্বে স্টুয়ার্ট স্কলারশিপ লাভ করেছিলাম। পরবর্তীতে হার্ভাড ডিভিনিটি কলেজ থেকে ও আমি স্কলারশিপ পেয়েছি।
একই সময়ে বােস্টনের ব্রিগহ্যাম হাসপাতাল থেকে দু'বছর মেয়াদি হাসপাতাল চ্যাপলিনের বহি:কোর্সেস সম্পন্ন করি।
হার্ভার্ড থেকে মাস্টার ডিগ্রি লাভের পর আমি ক্যানসাসের গ্রামে দু'টো ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চের মিনিস্টার রূপে কাজ করি। আমার লেকচার সমাবেশে এত বিপুল সংখ্যক শ্রোতা যােগ দিত যা চার্চের ইতিহাসে বহু বছর ধরে দেখা যায়নি।
